হালখাতা ও বাঙালির ব্যঙ্গ পত্র

বাংলা নববর্ষকে কেন্দ্র করে সুপ্রাচীনকাল ধরেই হালখাতার আয়োজন করে আসছেন ব্যবসায়ীরা! তাই বৈশাখ এলেই ব্যবসায়ীরা খুশিতে বাগবাগ হয়ে ওঠে! যদিও এতে পত্রপ্রাপকের পকেটের অবস্থা বেহাল হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে। কারণ পাওনাদারের চিঠি শুধু চিঠিই নয়, চরমপত্রও! সচরাচর এ চিঠিটি এক পাক্ষিক হয়ে থাকে। বাংলাদেশ ফাঁপড় গবেষণা টিম অনুসন্ধানে বেশ কিছু হালখাতাপত্র ও এর উত্তর।
চিঠি-১
আসিতেছে শুভদিন
দিনে দিতে বাড়িতেছে দেনা
শুধিতে হইবে ঋণ…।

সুধী,
জানিয়া খুশি হইবেন যে আগামী ১ বৈশাখ ১৪২০ তারিখে আপনার প্রিয় বাতেন জেনারেল স্টোরে হালখাতার আয়োজন করা হইয়াছে। জানিয়া আপনি আরো বেশি প্রীত হইবেন যে, সমুদয় দেনা পরিশোধ করিলে বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা করা হইয়াছে। আপনাকে এই বিশেষ ছাড় দিতে আমরা ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত অপেক্ষা করিবো। আশা করি আপনি নিজেকে বিচক্ষণ প্রমাণ করিতে আমাদের এই বিশেষ প্যাকেজ গ্রহণ করিবেন এবং সমুদয় দেনা পরিশোধ করিয়া ভারমুক্ত হইবেন।
বিনীত
ইমতিয়াজ আদনান

সমাধান হোমিও হল

সমস্যা তলা,দুলালপুর।


দেনাদারের উত্তর
প্রিয়আদনানভাই, দাওয়াত দিয়াছেন তাই আমার খুশির সীমা নাই!
আমার এই খুশি আরো হইতো যদি চিঠির সহিত পাওনা টাকার অঙ্ক সংযুক্তি করিতেন। কারণ আমারতো আপনার কারবারপদ্ধতি সম্বন্ধে বুঝিবার জেনারেল নলেজটুকু নাই। নাই বলিয়াই বুঝিয়া পারি না, এক সপ্তাহ আগে দোকানের বকেয়া টাকা কত হইলো তাহা দেখিয়া শ্বশুরবাড়ি গমন করিনু। কিন্তু এক সপ্তাহ পর দেখিলাম, টাকাটা দ্বিগুণ হইয়া গিয়াছে! & কীভাবে , কে করিলো বুঝিতে না পারিয়া নিজের অজ্ঞানতাকে দোষারোপ করিয়াছি। টাকার সর্বশেষ পরিমাণটা জানাইয়া ফিরতি পত্র দিলে কৃতার্থ হইবো।
ইতি
বাকিউর রহমান
চিঠি-২
আদবকায়দা সহযোগে সালাম নিবেন। হাজার হাজার না, লাখ লাখ সালাম। আশা করি কুশলে আছেন। আপনার বদান্যতায় আমি এদেশে নতুন একটা বিষয় প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছিÑজানি না এটা সৌভাগ্য নাকি দুর্ভাগ্যের ফের। আপনি আমার বন্ধু মানুষ। আর বন্ধু হয়ে বন্ধুকে বিপদাপদে সাহায্য-সহযোগিতা করার প্রবণতা সব মানুষের মধ্যেই আছে। বিপদে পড়ে আপনি আমার কাছ থেকে বিশ হাজার টাকা ধার নিলেন। খুশিমনেই আপনাকে দিলাম। যাওয়ার সময় গদগদভাবে বলে গেলেন, এই ঋণ জীবনেও শোধ করতে পারবো না। তারপর তো অমাবস্যা-পূর্ণিমা মিলিয়ে অনেক প্রহর এলো আর গেলো, আপনি টাকা পরিশোধের নামও নিলেন না! আসছে বৈশাখে আপনার সাথে হালখাতা করতে চাই। হালখাতায় পাওনা থেকে কম টাকা দেওয়ার নিয়ম প্রচলিত আছে। আপনিও দিবেন। ঠেকায় যখন পড়েছি। হালখাতায় কী দিয়ে আপ্যায়ন করলে খুশি হবেন ফিরতি পত্র মারফত জানাবেন আর যথাসময়ে এই গরিবখানায় চলে আসবেন।
আপনার বিশ্বস্তÑ ধারের টাকা চেয়ে হালখাতা করতে চাওয়া আহাম্মক
বেকুব আলী
দেনাদারের উত্তর
আপনাকে আমি ভদ্রলোক বলেই জানতাম! তাহলে কেন এই বালখিল্যতা? টাকা ফেরৎ দেবো মানে? যেখানে আপনি নিজ কলমে স্বীকার করে নিয়েছেন, আমি বলেছি এই ঋণ জীবনেও শোধ করতে পারবো না। তাহলে আবার নতুন করে টাকা চাওয়া কেন? আপনার বয়স তো এখনো আশি হয় নাই, ভীমরতি পাইলো কেন? সার্টিফিকেট এইজ ভুয়া নাকি? অপমান করেছেন, কিচ্ছু মনে করিনি। দাওয়াতের জন্য ধন্যবাদ। শুধু আমি একা নই, সপরিবারের দাওয়াত আপনার বাড়িতে। আমার নির্দিষ্ট পছন্দ নাই। আপনার রুচি অনুযায়ী রান্নাবান্না করাবেন। রান্না বেকায়দার হলে যা বলার আপনার ভাবিই বলবে।
আগামী মাসে আমার জন্য আরো কিছু টাকা রাখা যায় কি-না ভেবে দেখবেন।
ইতি
আপনার প্রিয় বন্ধু
চতুর মহাজন
রোমিও দোকানদারের হালখাতাপত্র-২
প্রাণপ্রিয় মিষ্টি বেগম, প্রাণঢালা ভালোবাসা জানিবেন। এই চিঠিখানা ভুলবশত আপনার কাছে যায় নাই। প্রত্যক্ষভাবে আপনি আমার দোকানের খদ্দের নন। আপনার বাবা শ্রদ্ধাভাজন হেকমত হোসেন আমার বাণিজ্য-লক্ষ্মী। তাঁহাকে এই চিঠি না পাঠাইয়া আপনাকে পাঠাইয়াছি কেন, তাহা আগে বলি। আপনাকে আমার ভালো লাগে। আপনি যদি চান, এই ভালোলাগাকে আরো বিস্তৃত পরিসরে নিয়া যাওয়ার প্রয়াস চালাইবো। সুতরাং ভাবিয়া দেখিয়াছি, আপনি এতো কাছের মানুষ; বাবা হইতে মামুলি বাজারসওদার টাকা রাখা সাজেনা। তাঁহাকে জানাইয়া দিবেন এখন হইতে কদম আলীর মুদিখানা তাহার জন্য উš§ুক্ত। হালখাতায় আপনি অবশ্যই আসিবেন। মিষ্টি সহযোগে আপনাকে আপ্যায়ন করাইবো। আপনি আমার সামনে বসিয়া মিষ্টি ভক্ষণ করিবেনÑএই দৃশ্য দেখিয়া অতুল শান্তিলাভ করিবো। আপনি চাহিলে আমরা দুইজন সামনাসামনি বসিয়া এক প্লেটেই মিষ্টি খাইবো। আপনি আমাকে খাওয়াইয়া দিবেন, আমি আপনাকে।
ইতি
কদম আলী
আপনার আব্বা হুজুরের ভাবী জামাতা
মিষ্টি বেগমের উত্তর
আমার নাম মিষ্টি বলিয়া, নামের প্রতি সুবিচার করিতে কাহাকেও কটুকথা বলিতে পারি না। পারিলে আপনাকে যে কী করিতাম! ভুলেভরা চিঠিখানা আমি বাবার হাতে দিয়াছি। যা বলিবার, যা কিছু করিবার তিনিই করিবেন। মিষ্টি এতো সস্তা মেয়ে না, আপনার ফাও প্রেমে সাড়া দেবে। কলেজে যাইবার প্রাক্কালে কতদিনই তো আপনি আমাকে চকলেট-লেবেঞ্চুস, তেঁতুল-বরইয়ের আচার দিতে চাহিয়াছিলেন। আপনার ওইসব আলগা পিরীতি ভালো লাগে না বলিয়াই কখনো আপনার ভাঙা বেড়ার দোকানের দিকে ফিরিয়াও তাকাই নাই। এক্ষণে আপনি কোন সাহসে ভর করিয়া এমন সব নাহক প্রস্তাব পেশ করিলেন। বাবা বাঁশঝাড়ে কঞ্চি কাটিতেছেন। আমিও খুঁজিয়া দেখি, বাড়িতে মোটা কোনো লাঠিসোটা আছে কি’না!
খারাপ থাকিবেন।
মিষ্টি বেগম (আপনার জন্য তিতা)
পাওনাদারের চিঠি-৩
জনাব, জেনে খুশি হবেন, আপনার প্রিয় কুমিল্লার রসমালাই ও কালোজাম হালখাতা উপলক্ষে আনয়ন করিয়াছি। আগের মতো জিলাপি-নিমকি খাওয়াইয়া রুচি নষ্ট করিবো না। আপনার সৌজন্যে অন্যরাও এই অমৃতসুধা উপভোগ করিবে। মিষ্টি খাইবার বাসনা পোষণ করিলে সময়মতো কড়ায়-গণ্ডায় সমুদয় টাকা নিয়া চলিয়া আসিবেন।
ইতি
আপনার একমাত্র (বাকির) সম্বল
মোকছেদ ভাই
দেনাদারের উত্তর
খ্যাতনামা মিষ্টান্ন আনয়ন করিয়াছেন জানিয়া প্রীত হইলাম। কিন্তু কথা হইলো, ২ টাকার দ্রব্য ৪ টাকা; ১০টাকার দ্রব্য ১৭ টাকা বাকি খাতায় লিখিয়া আবার মিষ্টিমুখ করাইবার কী দরকার! আপনি যাহা করিতেছেন, বিষক্রিয়ায় এমনিতেই ত্রাহি অবস্থা! আবার কেন! আপনার কালোহাত হইতে মুক্তিলাভে ইচ্ছুক।
ইতি- মুক্তি মণ্ডল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *